ম্যুভি রিভিউ- "দ্য স্পীড"

অনেকদিন পর বলাকায় গেলাম বাঙলা সিনেমা অনন্ত জলীল অভিনিত ম্যুভি "দ্য স্পীড" দেখতে। সিনেমা শুরুর আগে পর্দা সরে গেল সিনেমা হলের এবং স্বাভাবিক ভাবেই জাতীয় সংগীত মিউজিকে পরিবেশন । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম প্রায় ৩০% দর্শক সে সময় বসা থেকে উঠার নাম পর্যন্ত করেনি এই কয়েক মিনিট দাড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শণ করতে। সিনেমার শুরুই হলো বেশ দারুন সাউন্ডের ইফেক্ট দিয়ে। "দ্য স্পীড" নামটিকে সার্থক করতেই হয়তো।

১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসের কোন একদিন

মানুষের জীবনে বোধ সঞ্চারের এক নির্ভেজাল উপাদানের নাম কবিতা। কবিতা কখনো মানুষের মনকে রাঙিয়ে দেয়, কখনো বদনার কালো রঙ ঢেলে উপলব্ধিগুলোকে সতেজ করে তোলে; জীবন দর্শনের পথকে করে প্রশস্ত।

নারী-পুরুষ নিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলি

'জেন্ডার' শব্দটি মুলত নারী ও পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, বোঝায় নারী-পুরুষকে নিয়ে বৈষম্যহীণ সমাজের, রাষ্ট্রের কথা। সংস্কৃতি ও সমাজ নারী ও পুরুষ সম্পর্কে যে সব দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে, ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতে শেখায়, কিংবা ভুমিকা পালন করতে বলে, সেসবই হচ্ছে জেন্ডার।

সৌদি নারী...অতঃপর রোকেয়া

যদি আজ থেকে প্রায় একশ বছর পেছনে তাকাই বেগম রোকেয়ার (রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন১৮৮০-১৯৩২) জীবনে যিনি সৌদি নারীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাননি কিন্তু তার দেখানো আলোতে এখনও আমরা পথ দেখি।

নারী....আর কতোকাল রবে শুধুই অর্কিড হয়ে!

প্রচলিত ধ্যান-ধারণা হচ্ছে নারী হবে নরম-কোমল, সর্বংসহা (মাতা), মনোরঞ্জনকারিনী (বধূ)। তারা থাকবে অন্দরমহলে। আর তাই প্রবাদে শোনা যায়... 'ঝি নষ্ট হয় হাঁটে, বউ নষ্ট হয় ঘাটে'।....অর্থাৎ ঝি কে হাঁটে-বাজারে-মার্কেটে পাঠানো যাবে না আর বউকে পুকুর ঘাটে পাঠানো যাবে না (যদিও গ্রাম এলাকায় পরিবারের পানির যোগান দাতা সাধারণত নারীই)।

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

স্যার, এই পেশায় আপনাকে মানায় না !


বেসিনে মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতে সিক্তার মন  উড়ে গেল সেই সুদুর অষ্ট্রেলিয়ায়  মোনাশ  ইউনিভার্সিটিতে! ...স্যার, কতো দিন আপনাকে দেখি না! মানুষ এভাবে হারিয়ে যায়?! আজব!... হঠাৎ করেই মিনিটখানেকের জন্যে বিষন্নতা ঘিরে ধরলো সিক্তাকে। ওর মধ্যে একধরনের পাগলামী আছে। জীবনে শিক্ষকতা পেশায় যাবে এটা ওর কল্পনাতেও ছিল না। সিক্তার কাছে শিক্ষকতা পেশা হলো চরম স্লো একটা পেশা। মানুষ এ পেশায় এলে অথর্ব হয়ে যায়। মানুষের ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট হয়ে যায়। এসব ধারণাই ও পোষণ করতো বরাবর।
ছোট বেলায় কাজিনকে দেখেছে ইডেন কলেজের ইতিহাসের প্রফেসর ছিল। নার্গিস আপাকে আত্নীয় স্বজনরা সবাই বেশ দাম দিত। সরকারী কলেজের অধ্যাপক বলেই কি না জানি না। কিন্তু সেই তুলনায় নিজাম ভাইজান যে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্টে পড়েছে তাকে কেউ পাত্তাই দিতো না! অবশ্য ডাক্তারী পড়া কাজিন হেলাল ভাইকেও কেও গনায় ধরতো না।তবে নার্গিস আপা মেয়ে বলেই নিশ্চয় আলাদা দাম পেত। ছোট বেলায় সিক্তা খেয়াল করতো যখন নার্গিস আপা বাসায় আসতো বেশ একটা আনন্দ ঝলমল ভাব দেখতো মায়ের চেহারায়। মাযের সাথে নার্গিস আপার হেব্বি খাতির দেখে সিক্তারও খুব ইচ্ছে করতো মায়ের বয়সের কাছাকছি কাজিনের সাথে ভাব জমাতে। সেজন্যেই সে প্রফেসর নার্গিসকে আপার সাথে "তুমি"টা বেশ জোর দিয়ে ডাকতো। কিন্তু নার্গিস আপার পেশাগত কোন বিশেষত্ব সিক্তার চোখে পড়েনি! শিক্ষকতা পেশা যে নিজের জীবনে গ্রহণ করা যায় তা নার্গিস আপার কোন আচরণে অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো ছিল না। এমনকি হুমায়ুন ভাই যখন বাসায় এসে তার চাকুরীর প্রথম দিনের গল্প বেশ মজা করে বলতো যে ... জানিস আমার স্টুডেন্টরাতো আমার চেয়েও বয়সে বড়!... এসব শুনে সিক্তা আরো অবাক হয়ে যেত। এটা কেমন করে সম্ভব! সেই বয়সে বুঝতো না যে অনার্স শেষ করেই সিভিল সার্ভিসে ঢোকা সম্ভব। তাতে স্টুডেন্টদের বয়সের কাছেই টিচারের বয়স হতে পারে।
পছন্দের আর কোন সাবজেক্ট না থাকায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়ে সিক্তা এমনিতেই বিরক্ত ছিল। তাদের মধ্যে আবার  সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা হারুন স্যার বা জাহাঙ্গীর নগর থেকে পাশ করা রিপন স্যারও কোন প্রভাব ফেলতে পারে নি। বরং আশফাক স্যারের আচরণে, পড়ানোর ঢঙয়ে এই পেশার প্রতি আরও বিরক্ত ছিল।

দ্বিতীয়বার মাস্টার্স করতে যেয়ে নাজমুল স্যারের ক্লাসে একদিন স্যার সবার সাথে পিচ্চি এক বালককে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সাইদ নিয়াজ , মাত্র দুদিন আগে দেশে ফিরেছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সেকেন্ড মাস্টার্স করে। উনি নাকি রিসার্চের কোর্সটা নিবেন! সিক্তাতো পুরোই আতঙ্কিত! ...ক্লাসমেট হাবিবকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো ..আমার পক্ষে এমন বালকের ক্লাস করা সম্ভব না! সাইদ নিয়াজ এরপর থেকে নাজমুল স্যারের সাথে নিয়মিত ক্লাসে এসে একটা পাশে চুপচাপ বসে ক্লাস দেখতেন। তৃতীয় দিন স্যার ক্লাসে আসার আগেই সিক্তা সাইদ নিয়াজ স্যারের সেই নির্দিষ্ট সিটটি দখল নিয়ে বসলো। সাইদ স্যার চুপচাপ পেছনের একটা সিটে চলে গেলেন। মিচকা হাসি দিয়ে হাবিবের দৃষ্টি আকর্ষন করলো, দেখে হাবিবও শয়তানী হাসি দিয়েই স্যারের পেছনে যাওয়া দেখছে।

রিসার্চের ক্লাসের প্রথম দিনতো সিক্তা সাইদ স্যারের দিকে তাকাতেই পারছে না! মনে পড়ে যাচ্ছে কাজিন হুমায়ুন ভাইয়ের কথা! বয়সে বড় স্টুডেন্ট :( সেই কথা মনে হতেই ঢোক গিললো! সাইদ স্যারও নিশ্চয়ই বাসায় যেয়ে হাসাহাসি করবে! অদ্ভুত! প্রথম দিনই স্যার খুব প্রফেশনাল আচরণ না করলেও অনেক আন্তরিক ছিলেন। দুই তিনটা ক্লাস পার হতেই সিক্তা মন খারাপ করে খেয়াল করলো স্যারকে ওর মনে ধরে যাচ্ছে! ঠিক স্যার হিসেবে নয়! কেমন যেন মায়া লাগছে! এমন স্পীড আছে যার চরিত্রে সে কেন এমন ভেন্দামার্কা একটা পেশায় আসবে!? কয়েকদিন পর স্যারের রুমে গেল রেফারেন্স-এর কথা জিজ্ঞেস করতে। কথায় কথায় সিক্তা মুখ খুলে বলেই ফেললো
:স্যার, এই পেশায় আপনাকে মানায় না! :(
সাইদ স্যার খুব সহজ একটা হাসি দিলো
...কেন? আমাকে কি টিচার মনে হয় না?
: ঠিক তা না স্যার,
ঠোটের কোনে হাসি ঝুলিয়েই বললো
...তবে?

:আপনাকে দেখে যতোটা স্পীডি মনে হয়, এই পেশার সাথে তা যায় না। টিচিং প্রফেশন এতো স্লো! একেবারে কচ্ছপের মতো! 
সিক্তার এই কথা শুনে স্যার সশব্দে হেসে উঠলেন।

এভাবেই সাইদ স্যারের কাছে সিক্তার যাতায়াত বাড়তে থাকে। যখনই স্যারের রুমে যায় সবসময়ই স্যার মগ্ন হয়ে পিসিতে কাজ করছেন! আবার অদ্ভুত অদ্ভুত চায়নিজ গানও শুনেন! পেনড্রাইভের ব্যবহার প্রথমে সাইদ স্যারের কল্যানেই শিখে। অথচ নিজের ঘরেই আরিফ আরো আগে থেকেই অফিসে পেনড্রাইভ ব্যবহার করলেও সিক্তার কোন ধারণা ছিল না। পড়ে ছিল মান্ধাতার আমলের ফ্লপি ডিস্কে। ইউএসবি পোর্ট বলে যে কিছু আছে তা স্যারের কাছ থেকে শুনে বাসায় এসে আরিফকে জিজ্ঞেস করলে আরিফ দেখিয়ে দেয়। অথচ আরিফ উদ্যোগি হয়ে কখনো কিছু সিক্তাকে শিখায় না। আরিফের দর্শন হচ্ছে সিক্তা নিজের আগ্রহে সব শিখবে তবেই তাতে গুরুত্ব থাকবে।
ঈদ, নতুন বছর এসবে সিক্তা বেশ উৎসব করেই স্যারকে কার্ড গিফ্ট করে। এর মধ্যেই মাত্র কয়েকমাস পার হয়েছে। একদিন স্যার হাসতে হাসতে সিক্তাকে একটি ইংরেজিতে লেখা Action Research নামের একটি বই ধরিয়ে দেয়। সিক্তা অবাক হয়ে দেখে বইয়ের কভার পেজে লেখকের নামের জায়গায় সাইদ নিয়াজ নাম লেখা। উচ্ছসিত হয়ে স্যারের অটোগ্রাফ চায় ...কিন্তু সেদিন সাইদ স্যার কোনভাবেই সিক্তাকে অটোগ্রাফ দেয়নি। বেশ রাগ লেগেছিলো স্যারের উপর, কিন্তু করার কিছু নেই। পরে সিক্তা খেয়াল করলো স্যার শুধূ ক্লাসের সবার মাঝে ওকেই সৌজন্য কপি দিয়েছে। এমনকি কলিগ কায়সার আহমেদকেও দেয়নি। কায়সার আহমেদ অবশ্য এ নিয়ে সিক্তাকে খোঁচা দিতে ছাড়ে নি। আর কায়সার আহমেদ স্যারকে দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। উনাকে কখনো পড়তে বা পিসির সামনে সিক্তা দেখেনি। বরং স্টুডেন্টদের সাথে টাঙ্কি মারতেই কায়সার স্যার ব্যস্ত সর্বদা। অনার্সের মেয়েগুলিকে কায়সার স্যারের রুমে ঢোকার আগে নিজেদের কপালের টিপ ঠিক আছে কি না তা আয়না দিয়ে চেক করে নিতেও দেখেছে।
সিক্তার মাঝে সাইদ স্যারকে নিয়ে একটা পাগলামী চলে এসেছে। ডিপার্টমেন্টে এসে স্যারের রুমে আলো না দেখলে যেন ওর নিজের মনের ঘরটাই অন্ধকার হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে স্যার একসময় সিক্তাকে সন্দেহ করা শুরু করলো। এক বাচ্চার মা সিক্তা স্যারের প্রেমে পড়েছে একথা হাবিব মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সিক্তাকে নিয়মিত বলা শুরু করলো স্যার নির্ঘাত সিক্তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে! কিন্তু সিক্তা স্যারকে এতো বেশিই পছন্দ আর শ্রদ্ধা করে যে এসব কথা শুনে কেমন অসহায় বোধ করে। বিবাহিত হওয়ার কারণেই শরীরের চাহিদা সম্পর্কে সিক্তার খুব টনটনে জ্ঞান থাকলেও কোনদিনই স্যারকে নিয়ে শরীর সম্পর্কিত কোন বাজে চিন্তা মাথায় আসে নি। একথা স্যারকে ও কেমন করে বোঝায় যখন স্যার ফোন করে ওকে চেপে ধরে জেরা করে!
স্যারের বিয়েতে শাহবাগ থেকে ফুল দিয়ে পুরো বাসা সাজিয়ে দিবে, এমন পরিকল্পনার কথা স্যারকে জানিয়ে দিলেও স্যার যে কবে বিয়ে করবে তার নিশ্চয়তা নেই। এদিকে স্যার যে বিয়ে করে ফেলেছে সেকথা লুকিয়ে রাখে। বেশ কয়েকমাস পরে যখন আরিফ -সিক্তার সম্মতিতেই সিক্তা দ্বিতীয় বাচ্চার মা হতে চলেছে তখন  হাবিব খবর দেয় স্যার আরো আগেই বিয়ে করে ফেলেছে। হিসেব করে বের করে স্যার হয় তার ব্যক্তিগত জীবনকে পেশার সাথে আনতে চায়নি অথবা সিক্তাকে ভয় পেয়ে জানায় নি। সিক্তা বরং খুশিই হয় বেশ। আবরার হওয়ার মাস খানেক আগে একদিন হঠাৎ করেই স্যার সিক্তাকে ফোন করে। তার স্ত্রীর বাবু হয়েছে খবরটা দিতে। সাথে এটাও জানায় এ খবরটা সে ইউনিভার্সিটির তেমন কাউকে জানায় নি। সেদিন প্রথম সিক্তা নিজের গুরুত্ব স্যারের কাছে বুঝতে পারে। এর আগেও সিক্তার টেকি ব্যাপারে, নেটের ব্যাপারে অসীম আগ্রহ আর পড়ায় সিরিয়াসনেসের জন্যে স্যার ওকে বেশ পছন্দ করতেন। পাওয়ার পয়েন্টে রিপোর্ট প্রেজেন্ট করার পর স্যার মুগ্ধ হয়ে সেদিনই ডিক্লেয়ার দিয়েছিল সিক্তা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে খুব ভালো করবে। শ্বশুরবাড়ির কষ্টের সময়গুলো এভাবেই স্যারের অনুপ্রেরণায় কেটে যাচ্ছিল। জীবনটা এতো কষ্টের মাঝেও স্যারের অনুপ্রেরণায় কেমন যেন বর্ণময় মনে হয়। শেষের দিকে  সিক্তার শরীর ভারী হয়ে যাওয়ায় আর কন্টিনিউ করতে না পেরে সেই সময়ের দুইটা কোর্স ড্রপ করে। ছয়মাস পর সিক্তা আবার ক্লাস করা শুরু করে।  সিক্তার সাথে মাঝে মাঝে স্যার কেমন নিস্পিৃহ আচরণ করেন। কষ্টের বোঝা চেপে সিক্তা তবুও স্যারের সাথে দেখা করতে যায়।
এর মধ্যে স্যার চলে গেলেন আবার ইউরোপে আরেকটা মাস্টার্স করতে। সিক্তা যেন ডিপার্টমেন্টে এতিম হয়ে গেল।  অনেক যুদ্ধ করে আগস্টে কম্প্রিহেনসিভ শেষ করে এক সপ্তাহের মধ্যেই কলেজে চাকুরী হয়ে গেল। রেজাল্ট কি হবে জানে না তবে আগের সব সেমিস্টারের রেজাল্টে এখনও ফার্স্ট ক্লাস সহ ব্যাচের আর সবার চেয়ে এগিয়ে আছে।শুধ কমপ্রিহেনসিভে ফেল করলেই সব স্বপ্ন ধুলিস্যাত হয়ে যাবে। স্যারের কোন খোঁজ নেই। এর মধ্যে কলেজের টিচার্স রুমে একা বসে ক্লাসের জন্যে অপেক্ষা করছে, হঠাৎ করেই অপরিচিত ফোন,
:হ্যালো, কে বলছেন প্লিজ
...আমি সাইদ নিয়াজ
এই ফোনের কথাটা মনে করে এতোগুলো বছর পরেও সিক্তা কেমন যেন আবেগাক্রান্ত হয়ে যায়।

সিক্তা চিৎকার করে উঠে আনন্দে...
:স্যার, আমারতো একটা কলেজে চাকরী হযে গেছে!
সাইদ স্যার যে এতো খুশি হয়েছে তা স্যারের কন্ঠ শুনেই বোঝা গেল।
সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ স্যারের নাম্বারে এমনিতেই ফোন দিল, স্যার নিজে ফোন রিসিভ করাতে সিক্তা চমকে উঠলো!  স্যার ফিরে এসেছেন, নতুন কোর্সের ক্লাস নেওয়া শুরু করেছেন। স্যারের সাথে যখন দেখা করতে এলো, পূর্ব পরিচিত নিশাত ছিল স্যারের রুমে বসা। স্যারের আবার সেই নিস্পৃহ আচরণ!
আরিফ বলেছিল বাংলা একাডেমির মেম্বার হতে, সিক্তা খেয়াল করলো প্রকাশনা থাকলে মেম্বার হতে সুবিধে হয়। এদিকে কলেজে নতুন কোর্সের ক্লাস নেওয়া শুরু করতে যেয়ে পড়াতে পারে না বইয়ের সহজলভ্যতা না থাকায়। শেষে নিজেই নেট ঘেটে, কাজ শেষ করে বাচ্চাদের ঘুম পারিয়ে রাত জেগে কাজ করে খেটে খুটে একটা বইয়ের কাজ করে ফেললো। আরিফ একবারও প্রুফ পর্যন্ত দেখে দেয়নি। কিন্তু বইয়ের আনকোড়া একটা কপি হাতে পেয়ে সিক্তাকে জরিয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল সিক্তার সাফল্যে।
সাইদ স্যারকে যখন বইয়ের দুই কপি দিল তখন স্যারের উচ্ছসিত প্রশংসার বানে যেন সিক্তা ভেসে যাচ্ছিল। সিক্তার সব কষ্টই সার্থক। তার শ্রদ্ধেয় প্রিয় মানুষ দুজনের কাছেই সে চুড়ান্ত প্রশংসা পেয়েছে। কাজের গতি বেড়ে গেছে অনেকগুন। নতুন করে রিসার্চের কাজ শুরু করলো। জানে স্যার কাজ পাগল মানুষ। স্যারের কাছে কাজ ছাড়া লুতুপুতু ঢং করে কোন লাভ নেই।
ভয়ংকর খবরটা এরপরেই শুনলো...স্যার চলে যাচ্ছেন মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে। সাথে বউ, বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছেন। শুনেই স্যারের সামনে সিক্তা চোখের পানি আটকাতে পারে নি। হু হু করে কেঁদে ফেলেছিল।

সেদিন সিক্তা বলতে বাধ্য হয়েছিল ...স্যার, টিচিং প্রফেশনে আপনার মতো মানুষই প্রয়োজন , যারা শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাবে এবং তা বাস্তবে রুপ দিতেও সহায়তা করবে।

আজকে সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ। টিচার্স ডে। দুই বাচ্চার স্কুলের ক্লাস টিচারদেরকেই আর কোন গিফ্ট দিতে না পেরে হোটেল স্টার থেকে স্পেশাল নান, কাবাব, চিকেন টিক্কা কিনে জোর করে দিয়ে এলো। ছলো ছলো চোখে বেসিনের সামনে সিক্তার বড্ড বেশিই সাইদ স্যারের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে...



অনুপ্রেরণাদায়ী সকল শিক্ষককে শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাই  Happy Teachers' Day .

রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

সূর্য স্নান


আজকে সূর্যকে বড্ড দরকার ছিল...
আমার সবথেকে পছন্দের পোষাকগুলো বের করেছিলাম
অনেকটা সময় নিয়ে অনেক যত্ন করে ধুয়ে যখন বারান্দায় গেলাম
সূর্য আজকে আমায় আলো দিতে পারবে না
সাফ জানিয়ে দিল!
আমার এতো পরিকল্পনা, এতো প্রস্তুতি, এতো আশা ..গুনগুন করে গান গাওয়া সব যেন ধুলায় মিশে গেল!
চরম হতাশায় শরীরের সবটুকু শক্তি যেন নিমেষেই হারিয়ে গেল!
শরীরটাকে কেমন যেন বড্ড বেশি ভার, বোঝা মনে হচ্ছিল!
শুধু মাত্র সূর্য আজ আমায় আলো দিবে না বলাতেই আমার এতো ভেঙে পড়া নিজেও মানতে পাচ্ছিলাম না
কিন্তু নিজেকে সামলানো কষ্টের হয়ে যাচ্ছিলো!
   সূর্য যেন মেঘের আড়াল থেকে চোখ টিপ দিল!
কিন্তু সূর্যর চোখ টিপ কি আর আমার চোখে পড়ে :(
শরীরটাকে টানতে টানতে যখন ফিরে আসছিলাম
তখন হঠাৎ করেই পেছনে তাপ  লাগায় সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে ............  আমি বিস্ময়ে হতভম্ব!
আমি যেন সূর্যের দিকে তাকাতেই পাচ্ছিলাম না
সূর্যের কাছে এতো লজ্জা নিজেই নিজেকে লুকোতে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।
সবগুলো কাপড় মেলে দিয়ে এলাম
সাথে সূর্য স্নান

আহা স্বপ্ন স্বপ্ন সব কিছু আজ লাগছে
আমার সঙ্গী হয়ে চন্দ্র তারা জাগছে
:D


রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১২

বলদাহ গার্ডেন














                                     









সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১২

♣জীবনটা আরো সুন্দর হতে পারে কতো সহজেই!♣


"CORE SPOT" বা জীবনের আলোকিত দিক গুলি নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করবো। আসলে আমাদের জীবনের আলোকিত দিকগুলোকে আমরা অনেকসময়ই বুঝতে পারি না। এখানে আমি প্রতিটা শব্দকে আলাদা করে ভেঙ্গে বলার চেষ্টা করলাম। জীবনটাকে এভাবে দেখুন Think positive, Be positive, Act positive
C-Creative
নিজের সৃজনশীল ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলুন। কি অফুরন্ত প্রাণ শক্তি আপনার মধ্যে আছে তা হয়তো আপনি নিজেও জানেন না। নৈরাশ্যবাদীরা ভাবতে পারেন "ধুর! আমার দ্বারা কিছুই হবে না..." কিন্তু যিনি এমন করে ভাবছেন তিনিই একসময় সাধনা, মনোবল আর অনুপ্রেরণার জোরে অনেক অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারেন। ভাবুন তো কখন্ও কখন্ও ব্লগিঙটাকে অসহ্য মনে হয় না?! কিন্তু কেউ যদি আপনাকে এর পজিটিভ দিকগুলি দেখিয়ে দেয় বা, আপনার প্রিয় কোন ব্লগার আপনার পোস্টে গিয়ে কিছু গঠনমুলক মন্তব্য করে আসে তখন কিন্তু আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে ব্লগিং করতে ইচ্ছে হবে। কাজেই মনের জোর হারাবেন না। আপনিই পারবেন।

O- Open
এখানে "Open" শব্দটিকে নিজের মধ্যে অকপটতাকে বোঝানো হয়েছে। কপটতা দিয়ে সাময়িক জয় লাভ করতে পারেন, ক্ষমতা আপনার কুক্ষিগত হতে পারে কিন্তু আপনার মনুষত্যবোধ কপটতাকে কখন্ও সমর্থন করবে না। কাজেই অকপটভাবেই নিজেকে প্রকাশ করুন, এতে আপনার ক্ষতি নয় বরঙ লাভই হবে।

R- Respectful to others
অন্যকে অশ্রদ্ধা করে নিজে কখন্ও শ্রদ্ধা পা্ওয়ার আশা করা ঠিক নয়। আপনি যেমন আচরণ করবেন তেমনই আশা করা উচিত অন্যের কাছ থেকে । ব্লগে এই বিষয়টা খুব দেখা যায়। আমরা সুযোগ পেলেই অন্যের উপর ঝাপিয়ে পড়ি। কিন্তু এমন সুযোগ্ও কিন্তু আপনার প্রতিপক্ষ পেতে পারে। তাই অন্যকে প্রতিপক্ষ না ভেবে বন্ধু ভাবুন, শ্রদ্ধা করুন (ছাগীয়তাবাদী সর্বদাই বর্জনীয়) । 

E- Ethical
নীতিতে আপনাকে অটল থাকতে হবে। কেউ আপনার অন্যায় আচরণ বা অন্যায় কাজকে সমর্থন করলেই ভাবা ঠিক নয় যে তাই করা উচিত। 
একটা কথা সবারই জানা- 
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। 

S- Simple (be simple)
"মুই কি হনুরে" এ ধরণের মানসিকতা মানুষকে কখনো বড় করে না। সাধারণের সাথে যতো বেশি মিশে যেতে পারবেন ততই জীবনটা অনেক বেশি উপভোগ্য, সুন্দর, আনন্দদায়ক হবে।

P- Passionate
এখানে "Passionate" দিয়ে কাজের প্রতি প্রবল আগ্রহের কথা বোঝানো হয়েছে। তীক্ষ বুদ্ধি দ্বারা কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমেই কাজের প্রকৃত ফল লাভ সম্ভব। 

O- Ownership (have ownership)
যখন কোন কিছুতে নিজের বলে মনে হয়, ওনারশীপ জাগ্রত হয় তখন সেই কাজটার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায় অনেক বেশি। যারা সামুকে ভালোবাসেন তাদের মধ্যে এই মানসিকতাটা কিছুটা হল্ওে জন্মেছে। এ কারণেই তারা চান সামুতে সুস্থ্য ধারার ব্লগিং হোক। এ কারণেই তারা সামুতে কোন অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতে পারে না। 
আরেকটা বিষয় দেখুন- আপনার ভালোবাসার মানুষটির প্রতি যখন আপনার ওনারশীপ জাগ্রত হবে তখন আপনি তার ব্যাপারে কেয়ারী হবেন আগের সময়ের চেয়ে বেশি। এ কারণেই মায়ের কাছে সন্তানরা এতো মূল্যবান।

T- Transparent 
অকপটতা নিয়ে বলা হয়েছে আগেই । এখানে আরেকটু বলি, নিজেকে অন্যের কাছে স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করুন। এতে আপনি তার বিশ্বাসভাজন হবেন সহজেই । আপনার উর্ব্ধতন কর্মকর্তা বা সহকর্মী বা প্রিয় মানুষটির কাছে আপনি তখনই বেশি গ্রহণযোগ্য হবেন যখন আপনি আচরণে, কাজে স্বচ্ছ থাকবেন।

উপরের কথা গুলো একেবারেই আমার নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করলাম। কারো কোন মতামত থাকলে সাদরে গৃহিত হবে।

জীবনটাকে সুন্দর করে দেখুন। জীবনটা আসলেই অনেক সুন্দর। কাছের মানুষগুলোকে প্রাণভরে ভালোবাসুন, প্রতিদান পাবেনই।

শনিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১২

দীর্ঘশ্বাসের ঈদ!

ফুট ওভারব্রীজ পার হতে যেয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে।চৈতিকে এই পুরো মাসে একবারও এ পথ দিয়ে আসতে হয়নি। অস্থির লাগছে। এবার একটা ঝটপট রিক্সা পেলে বেঁচে যায়। আজব! পরিবাগ থেকে মৌচাক চল্লিশ টাকা চায়! টাকা কি গাছে ধরে নাকি?! ত্রিশ টাকার নিচে কেউতো যেতে চাচ্ছে না! শেষ পর্যন্ত যাই হোক এক জনের সাথে ২৫ টাকায় দফারফা হলো। সে সাধারণ অভ্যাস বশতই হুড টেনে দিতে চাইলো।

না, লাগবে না, রাখেন
বলে তাকে থামালো।
মোবাইলে ব্লগ দেখা ছেড়ে দিয়েছে বন্ধুরা চিল্লাচিল্লি করে বলে। কিন্তু এতোটা পথ রিক্সায় পার হওয়াও  আরেক কষ্টের ব্যাপার। তবে দেখতে ভালোই লাগে যখন কোন যুগল কেমন উরু উরু, খুশি খুশি মুডে উড়তে উড়তে রিক্সা দিয়ে যায়। মেয়েদের চেহারাগুলো খেয়াল করে ওদের মনের কথা বুঝতে চাওয়ার এই অভ্যাসে মাঝে মাঝে চৈতি নিজেই অবাক হয়ে যায়। মনে হয় ও যেন ওদের মনের কথা পড়তে পাচ্ছে। পায়ে হেঁটে শাড়ি পড়া শুকনো জিরজিরে এক মেয়ে গেল। কাঁধের ব্যাগ আর চেহারা দেখেই বোঝা গেল চাকুরী থেকে ফিরছে। কেমন যেন অস্থির লাগে চৈতির। মেয়েটি ওর মাথায় ঢুকে গেছে।আচ্ছা ওর স্বামী ওর এই মনমরা চেহারা দেখেই তৃপ্ত?! খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে একান্তে মেয়েটার সাথে। স্বামীরা হচ্ছে আজব প্রজাতির! ওরা বউটিকে সারাদিন খাটতে দেখে সুখ পায় আবার বউকে যথাযথ পরিপাটি হয়েও থাকতে হবে।আরে ব্যাপার আছে না, অফিসের গাল্লুগুল্লু ভোদাই মার্কা চেহারার সাবর্ডিনেটটিও যে যথেষ্টই পরিপাটি হয়ে থাকে।ইয়াং বসকে ভাইয়া ভাইয়া বলে জান কোরাবান করে দেয়। অথচ বাসায় ফিরে বউয়ের এহন মনমরা বাসি চেহারা দেখতে কারই বা ভালো লাগে।
হঠাৎ করেই মোবাইলে রিং বেজে উঠে,

-কি রে, কৈ তুই?
ঃ বাইরে
-বাইরে কৈ?
এই এক জ্বালা, তোমরা বাপু এ্যানোনিমাস থাকতে চাও আবার আমাগোরে খুঁচাইয়া খুঁচাইয়া কেন জিগাও?! আজব! মেজাজটা খারাপ হতে চেয়েও হয় না।
ঃ পরীবাগ রে
-এই বিকালে পরীবাগ কি করোস?
ঃাল, তোর লাইগা অপেক্ষা করি
ওপাশ থেকে হেব্বি ক্ষেপে গেছে
-দেখ চৈতি, আমার সাথে এইরকম কইরা কথা কইবি না
 তো , কিরকম কইরা কথা কমু, জান!
-এইভাবে কথা কইলে তোর সাথে কথা কওয়ার কোন মানে হয় না!
ঃ আরে ধুর! ক্ষেপস ক্যান, তোরে ক্ষেপাইয়া যে মজা পাওয়া যায় তার মজাই অন্য রকম ;)
-এই, আমি একটু পরে তোরে ফোন দিতাছি, একটা জরুরী কল আইছে।

চৈতি একাই কতোক্ষণ হাসলো। সাবির, খুব সহজেই ক্ষেপে যায়। আর ওরে ক্ষেপিয়ে মজাও বেশ। সামনের দিকে তাকালো রমনা থানা পার হয়ে মসজিদটা পার হচ্ছে রিক্সাওয়ালার দিকে খেয়াল করেনি এতোক্ষণ ভালোভাবে । হায় হায়! এ কি অবস্থা! চোখ আটকে গেছে-



নিজেকে কেমন অসহায় লাগছে! গলার কাছে কষ্টেরা দলা পাকিয়ে উঠছে। একটা শার্ট কিনতে পারে না! নিজেকে বোঝাতে কষ্ট হচ্ছে! মাহিনের কতো শার্ট আলমারিতে এমনিতেই পরে। আছে কয়দিন পর হয়তো গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। তার থেকে একটা শার্ট দিলেওতো বেচারার কতো কাজে লাগতো। অন্তত রিক্সা চালানোর সময় না হলেও বউকে বাইরে নিয়ে যাবার সময়তো অন্তত পড়তে পারতো। আহা বউকেই কি কখনো বাইরে নিতে পারে নাকি! চৈতি নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেয়। অস্থির লাগছে বড্ড।পিৎজা হাট, কেএফসি বা সরমা হাউজগুলোর কথা ভাবতেই মনটা তেতো হয়ে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু এই চৈতিই কি মনে রাখবে, কোথাকার কোন রিক্সাওয়ালার গায়ে জামা নেই।গন্তব্যে পৌঁছে ওর দিকে না তাকিয়েই পঁচিশ টাকার জায়গায় ত্রিশ টাকা দিয়ে চৈতি নিজেকে পৌচাশিক সান্তনা দিলো। হ্যাঁ, তাইতো। বাড়তি পাঁচ টাকায়তো আর ওর শার্ট কেনা হবে না। 
গন্তব্যে পৌঁছে কাজ সেরে যেতে হবে বেইলী স্টারে।মাহিন টেক্সট করছে, 
-kotokkhon lagbe?
coming
-ok, baily star-er nichey asi
thhik ase
তারাতারি সিগনেচার করতে গিয়ে ব্যাগ থেকে কলম খুজেঁ পাচ্ছে না। এই আরেক জ্বালা, আমার এই মহা সমুদ্র ব্যাগে কিছু রাখলে দরকারের সময় খুজেঁ লাগানোই মুশকিল। কখনো কখনো ফোন বাজতে থাকলেও খুঁজে হয়রান হই কিন্তু ফোন পায় না। পেতে পেত রিং বাজা সারা হয়ে যায়।
লাফাতে লাফাতে সিড়ি দিয়ে নেমে হাঁটা দিলো ও।মালিবাগ-শান্তিনগরের মোরে এলেই বকুলের কথা মনে পরে যায়! চৈতি জানে এই মনে পড়াটা আলেয়া ছাড়া আর কিছু না। তবুও মনকে মানাতে পারে না। কতোদিন ভেবেছে বকুলকে ওর বউয়ের সাথে নির্ঘাত ওর চোখে পড়বে। পড়েনি। একবারের জন্যে না। মনটা খারাপ লাগছে। কত্তোদিন বকুলের সাথে কথা হয় না!
মোবাইলটাতে বেশি খুজতেঁ হলো না, ডায়াল নাম্বারেই আছে...
আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে , আপনার কাঙ্খিত  গ্রাহককে ভয়েস এসএমএস পাঠাতে চাইলে স্টার প্রেস করে গ্রাহকের এগারো ডিজিটের  মোবাইল নম্বরটি ডায়াল করুন। দুই টাকা চার্জ প্রযোজ্য
 হুরর!! অবশ্য বকুলকে ফোন করে এরকম "হুরর" কথাটা চৈতিকে মাঝে মাঝেই বলতে হয়। করার কিছু নেই। মেনে নিয়েছে ও।
রিং বেজে উঠলো, এই রে, সারছে কনক ফোন দিসে, ধরুম না। রিসিভ করলেই ওর বাসায় যাইতে কইবো নিজে নিজেই বলছে। এখন ওরে বুঝাইতেও ইচ্ছে করতাছে না। চামে মোবাইলটা সাইলেন্ট করে দিলো ও। মোবাইলের রিং শুনলে  অস্থির লাগে। কেউ ফোন দিবে ভয়ে কয়দিন মোবাইলই বন্ধ করে রাখছিলো। ফোন অন করলেই দুনিয়ার মেসেজ আইসা হাজির :(
দুষ্ট একটা হাসি হেসে ফেলে হি হি! একটাও কল ব্যাক করি না। নাম্বার আমার মুখস্ত থাকলেতো করুম কল ব্যাক ;)
মাহিন নিচে দাড়িয়ে আছে, পাশেই দুজন তরুণী নিহার না কি যেন একটা তেলের বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্যস্ত। চৈতি খেয়াল করলো মাহিন আড়চোখে ওদের দিকে তাকায় কি না। ধুরর তাকালেই কি-চৈতি নিজেও তো কতোজনের দিকে তাকায়।তবে চোখ লাগে না কাউকেই! ইদানিং ও হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছে এতোগুলো বছর পার করে শুধু বকুলই কেন ওর চোখ জুরে থাকে। মনে হয় ওর চেয়ে আকর্ষণীয় কোন পুরুষ এই জীবনে দেখেনি। যদিও জানে এটা এই বয়সের ভাবনা হওয়া উচিত না। মাহিনকে কয়দিন বলতে যেয়েও পারেনি।মাহিন এসবে কিছু মনে করে না। জানে ওগুলো চৈতির মনের ঘরেই শিল্পিত থাকে।বাইরের জগতটাকে চৈতি কখনও কলুষিত করে না। সুচিকে বলেছিলো, ওতো হাসতে হাসতেই মরে। অবশ্য চৈতিও মজা করেই বলে এসব।
বেশ কতোগুলো দোকান দেখলো। সত্যিই বেইলী স্টারে এলে অন্তত বেশ কমের মধ্যে ড্রেস পাওয়া যায়। একারণে মাহিন এখানে এলে একসাথে দুই/তিন সেট ড্রেস সবসময়ই কিনে দেয়। একটা ড্রেস দেখেই ওর পছন্দ হয়ে গেল। গাউসিয়ার মতো  বিরক্তিকর কচলাকচলি করতে হয়না। ফিক্সড প্রাইস হওয়ার এই সুবিধাটা সব সময়েই ওর পছন্দ। সবার কেনাকাটা শেষ। ওর মা'র জন্যে ও বরাবরই জামদানী বরাদ্ধ রাখে। কাজেই এবার মায়ের জন্যে...একটা শাড়ী বেশ পছন্দ হলো। ইস! দাম একটুও কমাচ্ছে না। ধুরর! নাহ আরেকটা দোকান থেকে সহজেই মনমতো পাওয়া গেল আরকটা। সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরা দরকার। মাহিন তারাতারি করে ইফতারের জন্যে একটা কুমির কিনতে গেল, ওহ স্যরি কুমির মানে কুমির সাইজের ব্রেড। পছন্দ হলো না। ফিরে যাচ্ছে বেইলী স্টারের গেরেজের দিকে। চৈতি পিছে পিছে দেখতে দেখতে আসছে। সামনেই পড়লো এক অশিতিপর বৃদ্ধা। ইসস!


মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল-এবার ওর মা'র কথাই আগে মনে পড়লো।যদিও চৈতি ওর মাকে বৃদ্ধ ভাবতে একেবারেই নারাজ। সবাই বললেও কিন্তু ওর মানতে ইচ্ছে করে না। বাবা মারা গেছেন যখন ওর মায়ের বয়স ৩৫ এর কিছু বেশি। সেই মা এতোগুলো বছর বাবার মতো, বন্ধুর মতোই ওদের বড় করেছেন। চৈতি কখনও মানবে না ওর মা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন।নিজেকে সামলাতে না পেরে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে দশটা টাকা আলগোছে ধরিয়ে দিলো। বৃদ্ধা হাসলেন কি না বোঝা গেল না চামড়ার জটিল ভাঁজের কারণে। মার কাছে এবার ঈদের আগে যেতে পাচ্ছি না। ছেলেটাকে খতনা করাতে হলো...বাচ্চা মানুষ, ওর কাছে কাছেই চৈতিকে থাকতে হয়। কিন্তু ওরও যে মায়ের কাছে যেতে মন কাঁদে, ওর মাও যে ওকে দেখতে নিরবে অপেক্ষা করে অভিমান ভরা হৃদয় নিয়ে সেকথা নিজের ভেতরেই গুমড়ে মরছে।
গাড়িতে উঠে দরজা লক করে দিলো। মাহিন বারী সিদ্দিকির গান ছাড়লো "পুবালী বাতাসে, বাদাম দেইখা চায়া থাহি আমার নি কেউ আসে!..." চৈতি নিজেকে আর সামলাতে পাচ্ছে না...চোখের জ্বল বাঁধ মানছে না....



রবিবার, ৫ আগস্ট, ২০১২

"চিত্রাঙ্গদা"-নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।



কাব্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা' মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যান নিয়ে কিছু রূপান্তরসহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন কাব্যনাটক 'চিত্রাঙ্গদা'।. মণিপুর রাজকূলে যখনপুত্র সন্তান না হয়ে কন্যা সন্তান চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন । রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজনীতিবিদ্যাও । আর এর ফলে চিত্রাঙ্গদা পুরুষের সবল মানসিকতা নিয়েই বেড়ে উঠতে থাকলেও তৃতীয় পান্ডব অর্জুন যখন বার বছরের জন্যে ব্রহ্মচর্য ব্রত পালনের সময় ভ্রমণ করতে করতে এলেন মণিপুররাজ্যে তখন চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের প্রেমে অনুরক্ত হলেও বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের অভাবে অর্জুন চিত্রাঙ্গদাকে অগ্রাহ্য করেন। এতে অপমাণিত হয়ে চিত্রাঙ্গদা প্রেমের দেবতা মদন এবং যৌবনের দেবতা বসন্তের কাছে প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে রুক্ষ চিত্রাঙ্গদা হয়ে উঠেন অসামান্যা সুন্দরী এবং যথারীতি অর্জুন তার ব্রত ভেঙ্গে সুন্দরী চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন।
 কিন্তু ক্রমশ চিত্রাঙ্গদার মধ্যে দ্বৈত স্বত্ত্বার দ্বন্দ্ব শুরু হয় এজন্যে যে অর্জুন তাকে বাহ্যিক রূপের কারণে ভালোবাসে যেখানে চিত্রাঙ্গদার প্রকৃত অস্তিত্ব অবহেলিত।
এর মধ্যে মনিপুর রাজ্যের বিপদের আভাসে একসময় অর্জুন নারীর মমতায় প্রজা বৎসল,সাহসে শক্তিতে পুরুষের মতো সবল চিত্রাঙ্গদার কথা লোকমুখে জানতে পারে। রবী ঠাকুরের প্রকাশে-

শুনি   স্নেহে সে নারী
বীর্যে সে পুরুষ ,
শুনি   সিংহাসনা যেন সে
সিংহবাহিনী ।
  একজন পুরুষ মনে একজন রমনীয় সবল নারীকে দেখার উদগ্র বাসনায় অর্জুন প্রকাশ করে তার আগ্রহ -
আগ্রহ মোর অধীর অতি
কোথা সে রমণী বীর্যবতী
কোষবিমুক্ত কৃপাণলতা
দারুণ সে , সুন্দর সে
উদ্যত বজ্রের রুদ্ররসে ,
নহে সে ভোগীর লোচনলোভা ,
ক্ষত্রিয়বাহুর ভীষণ শোভা।

এমতাবস্থায় চিত্রাঙ্গদা নিজেকে অর্জুনের কাছে নিজেকে প্রকাশ করে এভাবে-

 নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।
                   পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে
                                  সে নহি নহি,
                   হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে
                                  সে নহি নহি।
                   যদি পার্শ্বে রাখ মোরে
                                  সংকটে সম্পদে,
                   সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
                                  সহায় হতে,
                             পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।

পরিশেষে এ উপলব্ধি হয় যে, বাহ্যিক রূপের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান মানুষের চারিত্রশক্তি এবং এতেই প্রকৃতপক্ষে আত্নার স্থায়ী পরিচয়।

শিল্পকলা একাডেমিতে স্বপ্নদল এর যুগপূর্তিতে জাহিদ রিপন-এর নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাট্যরূপ চিত্রাঙ্গদার উপস্থাপন ছিল অসাধারণভাবে আকর্ষনীয়।মঞ্চে চিত্রাঙ্গদার একটি চরিত্রের দ্বৈতসত্ত্বার উপস্থাপন ছিল অসাধারণ। নারী শুধুই নরম, কোমল, অসহায়-এই রূপটাকে ভেঙ্গে রবি ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদায়  আমি নিজে একজন নারী হয়ে এমন একজন নারীর প্রকাশই দেখতে চাই বাস্তব জীবনে।


------------------------------------------------------
তথ্য সুত্র:
রচনা: কাব্য নাটক
পরবর্তী রূপ: ১৯৩৬ সালে রচনা করেন নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা
প্রকাশকাল: ২৮ ভাদ্র, ১২৯৯ (১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ)
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
উৎসর্গ: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর' ১৫ শ্রাবণ ১২৯৯
১. চিত্রাঙ্গদা
২. নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা
৩. চিত্রাঙ্গদা
৪. রাজেন্দ্রনন্দিনী
৫. "স্বপ্নদল" প্রকাশিত যুগপূর্তি ব্রোশিয়ো ২০১২
৬.মঞ্চস্থ চিত্রাঙ্গদার স্থির চিত্র

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

তবুও তোমার করে রেখো...

তোমায়, কতোদিন ঠিক করেছি, তুমি যেমন করে চাও তেমন করেই থাকবো। তোমার চাওযার মধ্যে অন্যায় নেই। হয়তো মুখ ফুটে বলো না। কিন্তু আমি যে সবসময় আমার পিঠে তোমার স্পর্শ খুঁজেছি! আমি তোমাকে অনেক ঘৃণা করার পরও অনেক বেশিই ভালোবাসি। যদি একটু কম ভালোবাসতাম তবে হয়তো কষ্ট কম পেতাম। আমি কখনো তোমার স্ত্রী হতে চাইনি। যদিও সেই অধিকার নিয়েই অনেক গলা বাড়িয়ে ঝগড়া করেছি। তোমার স্বাধীনতায় অনেক বেশিই হস্তক্ষেপ করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি এখনো তোমাকে ভালোবেসে কষ্ট পাই। সেই কষ্ট ভুলতে তোমার ছায়ার সাথে সারারাত কথা বলে কাটিয়ে দেই। আমার নির্ঘুম রাত গুলো জুড়ে থাকে তোমাকে ভালোবেসে দূরে থাকার হাহাকার।আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আমি তোমার বন্ধু হতে পারিনি।আমি তোমার বন্ধু হতে পারিনি। এই কষ্টই আমি পাচ্ছি প্রতিটি মুহুর্তে।কিন্তু আমি বরাবরই বিশ্বাস করি আমি ঠিকই আমার পিঠে তোমার স্পর্শ পাবো। তুমিই একসময় আমায় জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলবে 'পনি, আমি তো সব সময়ই তোর ছিলাম।' কেন মিছে পাগলামি করে এতোগুলো মাস নির্ঘুম কাটালি, নিজেকে কষ্ট দিলি।' আমি তো কষ্ট পাচ্ছি। তোমাকে ভালোবেসে দূরে সরিয়ে রাখার কষ্ট। লিখতে যেয়ে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আজকে তোমার সেই পুরনো কাগজ গুলো নিয়ে বসেছিলাম। যেগুলোতে তুমি তোমার পছন্দের কিছু গান লিখে রেখেছিলে। ভেবেছিলাম কম্পোজ করে রেখে দিই। কিন্তু নষ্টালজিয়া আমায় অস্থির করে ফেললো। তোমার এই গানটা মনে আছে?...পিঞ্জিরার পাখির মতো আমি তারে উইড়া যাইয়া দেখি, কোথায় গো , আমার কালো পাখি...' মনে আছে...'ভালোবাসি, বলিব না, বলেছিলাম একদিন, কেদেছি অনেকদিন। এজ্বালার শেষ নাই, জীবনে আমার।' গানটা আমি ইউ টিউবে অনেক খুজেছি, পাইনি। গানের, সিডির দোকানের লোকগুলোও আমার নিরাশ করে ফিরিয়ে দিয়েছে। তোমার গানের খুব ভালো শ্রোতা ছিলাম একটা সময়। জানো, এখন যখন তুমি উদাস হয়ে বারান্দায় গান গাও, আমি কুন্ঠিত হয়ে যাই।তোমার কাছ ঘেসে দাড়াতে না পাড়ার ব্যর্থতায় আমার এই কুন্ঠাবোধ। আমার এই কুন্ঠাবোধে আমি বিপর্যস্ত। তোমার কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে না পাড়ায় আমি কুন্ঠিত। আমি আমার যোগ্যতা প্রকাশে ব্যর্থ হওয়ায় কুন্ঠিত। দেখো, আমি ঠিক তোমার কাছে ফিরে আসবো।আমার যোগ্যতার পরিপূর্ণ প্রকাশ করেই আমি ফিরে আসবো। আমি যে বিশ্বাস করি, তোমার কাছে আমি তোমার মতো করেই ফিরে আসবো। ততদিন শুধু একটু কষ্ট করে তুমি আমারই থেকো। - তোমার টুনটুনি। পুনশ্চ:তুমি কি একটু কষ্ট করে পড়বে? অনুরোধ রইলো। আমি তোমাকেই লিখেছি। কিন্তু তোমাকে লিখতে যেয়ে যেন তোমার ছায়াকেও লিখলাম! আমি এই পৃথিবীর সবাইকেই কচুরী পানার মতো দূরে সরিয়ে রাখতে পারি, কিন্তু তুমি বা তোমার ছায়া আমায় অস্থির করে রাখে। আমি কোন ভাবেই পারি না তোমার দিকে না তাকিয়ে থাকতে। কি করবো বলো?! এ যে আমার চরম ব্যর্থতা তোমাকে ভুলে না থাকতে পারা! আমি চাইও না তোমাকে ভুলতে।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites